ভোটের মাঠে সেনাবাহিনী

23
সেনাবাহিনী

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করতে গতকাল রোববার গভীর রাতে সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে সশস্ত্র বাহিনী তাঁবু গেড়েছে। তারা আজ ২৪ ডিসেম্বর থেকে আগামী ২ জানুয়ারি পর্যন্ত রিটার্নিং কর্মকর্তার চাহিদা মোতাবেক স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করবে।

রিটার্নিং কর্মকর্তার সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে টহল ও অন্যান্য আভিযানিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে সশস্ত্র বাহিনী। নির্দেশনা পেয়েই সশস্ত্র বাহিনী মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আলমগীর কবির নিশ্চিত করেন।
রোববার রাত ১২টার পর সেনাসদস্যরা দেশের বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নেন বলে আমাদের সংবাদদাতারা জানিয়েছেন।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি নেতারা সেনাবাহিনী নামার বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছেন। এর আগে তারা নির্বাচনে সেনাবাহিনীর বিচারিক ক্ষমতা চেয়েছিলেন।

এমনকি গতকাল তারা বলেছেন, সেনাবাহিনী শুধু দাঁড়িয়ে থাকলেও হবে। ‘আমরা যেন প্রচার চালাতে পারি, সেনাবাহিনী সে ব্যাপারে অবশ্যই সহযোগিতা করবে।’
বিএনপি মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, সেনাবাহিনী জনপ্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, বিএনপি ও গণফোরামের প্রার্থীরা মাঠে নামবেন এবং সেনাবাহিনী সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টিতে আগের মতোই সহযোগিতা করবে। সেনা মোতায়েনকে স্বাগত জানিয়েছেন ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, সশস্ত্র বাহিনী অবশ্যই সব দলের জন্য নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করবে। সেই সঙ্গে তারা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

গতকাল এ প্রসঙ্গে ড. কামাল হোসেন এক বিবৃতিতে বলেন, সেনা মোতায়েনের ফলে নির্বাচনী পরিবেশে অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি হবে। যেটি এর আগে ছিল না। তিনি বলেন, আমরা আশা করি, সশস্ত্র বাহিনী দেশের মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে না। কিংবা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবে না। সশস্ত্র বাহিনী দেশ ও দেশের মানুষের পক্ষে থাকবে। কোনো ব্যক্তির হস্তক্ষেপে তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হবে না।

আরও খবর  দশমিনায় নৌকা মার্কা প্রার্থীর এস এম সাহাজাদা সাজুর এক বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত

আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান এইচ টি ইমাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সেনাবাহিনী নির্বাচনে সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করবে। কেউ যেন নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্র না করতে পারে, সেই লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত এবং স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সশস্ত্র বাহিনীও যথাযথ দায়িত্ব পালন করবে।

গত বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে সেনাবাহিনীর ভূমিকা সম্পর্কে পরিপত্র জারি করা হয়।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ৩৯৪ কোটি ১৪ লাখ ৭৭ হাজার ৫১৭ টাকা বাজেট বরাদ্দ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করবে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, আনসার-ভিডিপি, কোস্টগার্ড, এপিবিএন ও সশস্ত্র বাহিনী।

কমিশন কর্মকর্তারা জানান, মোট বাজেটের মধ্যে পুলিশের জন্য ১০১ কোটি ২৬ লাখ ৮৪ হাজার ২৫০ টাকা, র‌্যাবের জন্য ১৩ কোটি ৫১ লাখ ৮০ হাজার ৫০০ টাকা, বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের জন্য ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) জন্য ৫৩ কোটি ৬১ লাখ ৩৪ হাজার ২৩২ টাকা, আনসার ও ভিডিপির জন্য ১৬৩ কোটি ৮১ লাখ ৭৫ হাজার ৬৫০ টাকা এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগকে ৬০ কোটি ৩৭ লাখ ২ হাজার ৯৫০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের বাজেট শাখা সূত্রে জানা গেছে, পুলিশের জন্য বাজেটের ১০১ কোটি ২৬ লাখ ৮৪ হাজার টাকার মধ্যে প্রথম ধাপে ৬৩ কোটি ২২ লাখ ৮৪ হাজার টাকা এবং দ্বিতীয় ধাপে ৩৮ কোটি ৪ লাখ টাকা দেওয়া হয়। র‌্যাবের মোট ১৩ কোটি ৫১ লাখ ৮০ হাজার টাকার মধ্যে প্রথম ধাপে ১০ কোটি ২০ লাখ ২৯ হাজার টাকা এবং দ্বিতীয় ধাপে ৩ কোটি ৩১ লাখ ৫১ হাজার টাকা, কোস্টগার্ডের জন্য মোট বরাদ্দ ১ কোাটি ৫৬ লাখ টাকার পুরোটাই প্রথম ধাপে পরিশোধ করা হয়েছে। বিজিবির ৫৩ কোটি ৬১ লাখ ৩৪ হাজার টাকার মধ্যে প্রথম ধাপে ৩৩ কোটি ২ লাখ ৪৪ হাজার টাকা এবং দ্বিতীয় ধাপে ২০ কোটি ৫৮ লাখ ৯০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। আনসার-ভিডিপির জন্য বরাদ্দকৃত ১৬৩ কোটি ৮১ লাখ ৭৬ হাজার টাকার পুরোটাই অগ্রিম হিসেবে একধাপে দেওয়া হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনীর ৬০ কোটি ৩৭ লাখ ৩ হাজার টাকার মধ্যে পুরোটাই আগাম দেওয়া হয়েছে।

আরও খবর  হঠাৎ ভোটের মাঠে বিজিবি

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, ‘রিটার্নিং কর্মকর্তা সহায়তা চাইলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সহায়তা করবেন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা। রিটার্নিং কর্মকর্তার সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজন অনুসারে উপজেলা থানায় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের নিয়োগ করা হবে। রিটার্নিং কর্মকর্তা বা প্রিসাইডিং কর্মকর্তার চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ভোটকেন্দ্রের ভেতরে বা ভোট গণনাকক্ষের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করবে সশস্ত্র বাহিনী। সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রয়োজনে ইসির কাজে যাবতীয় সহায়তা দেবে সশস্ত্র বাহিনী। প্রয়োজনে পরিস্থিতি বিবেচনা বা নির্দেশক্রমে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক-মহাসড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এই বাহিনী।

নির্দেশনায় আরো বলা হয়েছে, ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৭ থেকে ১৩২ ধারা অনুযায়ী কাজ করবে সশস্ত্র বাহিনী। অবৈধ সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করতে সশস্ত্র বাহিনীকে ডাকা হলে এ ক্ষেত্রে অন্য কোনো উপায়ে বেআইনি সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করা না গেলে ঘটনাস্থলে থাকা সর্বোচ্চ পদের ম্যাজিস্ট্রেট সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করার জন্য সামরিক শক্তি প্রয়োগ ও গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিতে পারবেন। জরুরি পরিস্থিতিতে যদি কোনো ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব না হয়, সে ক্ষেত্রে কমিশন্ড অফিসার সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করার জন্য সামরিক শক্তি প্রয়োগ এবং গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দিতে পারবেন। সামরিক শক্তি প্রয়োগের জন্য ম্যাজিস্ট্রেটকে লিখিত নির্দেশ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা না থাকলেও মৌখিক নির্দেশ দেওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব তা লিখিত আকারে দেবেন।

সরকারি আদেশে আরো বলা হয়, ঝুঁকি বিবেচনায় প্রতিটি জেলায় নিয়োজিত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যের সংখ্যা রিটার্নিং কর্মকর্তার সঙ্গে সমন্বয় করে কমবেশি করা যাবে। সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের বিবেচনায় প্রতিটি স্তরে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সেনাসদস্য সংরক্ষিত হিসেবে মোতায়েন থাকবেন। বিমানবাহিনী প্রয়োজনীয় সংখ্যক হেলিকপ্টার ও পরিবহন বিমান জননিরাপত্তা বিভাগ, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ও বাহিনীগুলোর অনুরোধে উড্ডয়নে সহায়তা করবে।

আরও খবর  বি এন পির চুরন্ত প্রার্থী ঘোষনা আটটার পরে

ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের বিষয়ে এ আদেশে বলা হয়, যে ছয়টি আসনে ইলেট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করা হবে, সেখানে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেওয়ার জন্য সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা থাকবেন। তবে বাহিনীর পোশাকে থাকবেন কিন্তু কোনো ধরনের অস্ত্র-গোলাবারুদ বহন করবেন না। ইভিএম কেন্দ্রে যেসব সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য থাকবেন, তাদের নিরাপত্তার জন্য সশস্ত্র বাহিনীর নিকটতম টহল দল ও স্থানীয় ক্যাম্প সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা বা প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

এতে বলা হয়, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে একটি কেন্দ্রীয় কো-অর্ডিনেশন সেল থাকবে। সেলের পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে অনুরূপ জয়েন্ট কো-অর্ডিনেশন সেল স্থাপন করা হবে। কেন্দ্রীয় সেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ, তথ্য মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধি ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিনিধি থাকবেন। সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে ২৭ ডিসেম্বর স্থাপিতব্য জয়েন্ট কো-অর্ডিনেশন সেল এ জননিরাপত্তা বিভাগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, সেনা, নৌ, বিমান বাহিনীসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধি থাকবেন।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২০১৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর থেকে ২০১৪ সালের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৫ দিন মাঠে ছিল সেনাবাহিনী। তারা সাধারণ এলাকায় একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও মেট্রোপলিটন এলাকায় একজন কমিশনারের অধীনে দায়িত্ব পালন করে। ওই নির্বাচনে সারা দেশে প্রায় ৫০ হাজার সেনাসদস্য দায়িত্ব পালন করেন। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি জেলায় একটি ব্যাটালিয়ন (৭৪০ সদস্য) ও প্রতিটি উপজেলায় এক প্লাটুন (৩৫ জন) সেনাসদস্য দায়িত্ব পালন করেন।