গণরুমের একদিন

210
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ছবি: ডেইলি স্টার

কোন এক জাদুকর বংশীবাদকের বাঁশির সুরকে কাছে থেকে উপভোগ করতে প্রকৃতি সে দিকে অশ্ববেগে দৌড়ে যাচ্ছে। তার দৌড়ের বেগ সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে প্রতিদিন আমাদের একটি নতুন সূর্য উপহার দিচ্ছে। এই সূর্য উদয় হয় সবুজ ঘাসের ডগায় শিশিরকে মুছে দিতে আবার হয়ত এই শিশিরকে অন্য কোন ঘাসে কিংবা ঐ ঘাসের ডগাতেই এনে দিতে অস্ত যায়।প্রকৃতির দৌড়ে আকাশে মেঘ জমে, বৃষ্টি হয়, চাতকের তৃষ্ণা মিটে, আকাশ আবারো ঝলমল করে উঠে। কত অদ্ভুত এই প্রকৃতির কারবার!

মানুষ আর কংক্রিটের শহর ঢাকা। এই শহরের মানুষগুলোর হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, স্বপ্ন হতাশার গল্পগুলো কান পেতে শুনে নিষ্প্রাণ ইট, বৈদ্যুতিক খুঁটি আর ধূলা। মানুষ মানুষেরগুলো শুনতে পায়না। কারণ তারাও প্রকৃতির মতোই কিসের টানে যেন ছুটে চলছে। কেউ কারো দিকে তাকাবে তার ফুরসত নেই। এই শহরের নিষ্প্রাণ ওভারব্রিজগুলো এসব দেখে যেন প্রাণবন্ত হয়ে হাসতে শুরু করে। যে হাসির মধ্যে ভাষা আছে। সে বুঝায়, এই তো আমিই বেশ আছি। ছুটাছুটির কোন তাগিদ নেই। এই ঢাকা শহর প্রকৃতির বাইরে নয়। তাই এখানেও প্রতিদিন নতুন সূর্য উঠে। তবে তার মুখ আকাশচুম্বী অট্টালিকার ভীড়ে দেখা যায়না। তবুও সে তার আলোতে এই শহরের মানুষদের জন্য ছড়িয়ে দেয় আশা, স্বপ্ন, আনন্দ, মায়া, প্রেম আবার হতাশা, বিষাদ, দুঃখ, বেদনা, ক্লান্তি।
আর এর সবগুলোই যেন উড়ে এসে এই শহরের একটি রুমে বিনা নিমন্ত্রণে ঘুরে যায়। এটাকে নিছক একটি রুম বললে এর অসম্মান হবে এমন কথায় কেউ দ্বিমত পোষণ করতে পারবেনা। এই একটি রুমই হয়ত পুরো ঢাকা শহর, সমগ্র বাংলাদেশও হতে পারে। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় ‘মিনি বাংলাদেশ’। এর থেকেও ‘মিনি বাংলাদেশ’ বলা যায় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে থাকা প্রতিটি গণরুমকে। যেখানে সঞ্চয় হয় বিচিত্র কিছু অভিজ্ঞতা। যেগুলো হয়ত কলেজ পেরিয়ে আসা কোমল, চঞ্চল, আবেগী একজন ঢাবিয়ানকে পরিপক্বতা দান করে। যেখানে টিকে থাকার লড়াই হয় প্রতি ক্ষণে। প্রতিটি গণরুম যেন স্বপ্নের রাজ্য।এই রুমে জমে থাকা ধূলায়, বিবর্ণ দেয়ালে, ছারপোকার রক্তে স্বপ্ন মিশে আছে। এই স্বপ্নই বাংলাদেশ গড়বে, বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে পরিচিত করে দিবে। স্যাঁতসেঁতে, অগোছালো রুমে বসবাস করে এই রুমের জীবনযোদ্ধারা বাংলাদেশকে গুছিয়ে গড়ে যাচ্ছে, যাবে।
হাজী মুহাম্মদ মুহসীন হল। সকাল সাতটায় চারতলার একটি গণরুমে ঘুমিয়ে থাকা প্রতিটি ছেলের কানে যেন কেউ মাইক লাগিয়ে দিয়েছে।বিকট শব্দ হচ্ছে।সেই শব্দ কোরবানির ছুরির চেয়েও ধারালো হয়ে সবার কানে আঘাত করছে। শব্দের দূষণে বেজায় বিরক্ত সবাই। বিরক্তের ভাব দেখলে মনে হবে কান না থাকলেই হয়ত তারা খুব খুশি হতো।
শব্দটা আসছে অনিকেতের ফোন থেকে। এলার্মের শব্দ। সকাল আটটায় ক্লাস। সকালে ঘুম থেকে উঠার একদমই অভ্যাস নাই তার। আসলে ইচ্ছাও নাই। আর প্রতিদিন রাত দুইটা/তিনটার আগে ঘুমোতেও যায়না সে। আসলে চাইলেও পারেনা। কারণ ক্যাম্পাসে রাত দশটায় মনে হয় মাত্র সন্ধ্যা হয়েছে। আর ফেইসবুকের কল্যাণে এখন সবসময়কেই তার দিন মনে হয়। কিন্তু দুর্বল দেহ, মস্তিষ্ক যে ২৪ ঘণ্টাকে দিন হিসেবে মেনে নিতে পারেনা। তবুও তাদের সাথে অনেক জবরদস্তি চলে কিন্তু যখন আর কুলিয়ে উঠা যায়না তখনই অনিকেত দেহ ও মস্তিষ্কের কথামতো ঘুমের দেবতার কাছে নিজেকে সোপর্দ করে। সময়মত ঘুমের দেবতা তাকে ঘুমের রাজ্যে নিতে পারেননি বলে তিনিও ক্রোধে তাকে সেই রাজ্য থেকে সকাল সাতটায় ছাড়পত্র দিতে রাজি নন। ঘুম দেবতার মনের কথাটি সে খুব ভালো করেই বুঝে গিয়েছিল তাই এলার্ম দিয়ে ঘুমের দেবতাকে পরাজিত করার চেষ্টা করে। কিন্তু ঘুমের দেবতা তো আর মোম দিয়ে তৈরি না যে একটু আগুনের ছোঁয়া লাগলো আর গলে গেল। এলার্মের শব্দ শুনে সে অনিকেতকে আরো চেপে ধরে। যার ফলে অনিকেত একটু পরপর ঘুমের ঘোরে এলার্মকে ‘Snooze’ করে রাখে। একটু পর আবার বাজে আবার ‘Snooze’ করে রাখে। এমন করতে করতে ৭.৪০ মিনিট হয়ে যায়।
এই সময়ের মধ্যে রুমের সবার কাছে মনে হয় রুমে যেন ঝড় শুরু হয়েছে।প্রথম বর্ষ থেকেই বিসিএসের স্বপ্ন দেখা পড়ুয়া ছেলে থেকে রাজনীতি করার স্বপ্ন নিয়ে সারারাত বাইরে ঘুরাঘুরি করা ছেলেটি কিংবা ফোনে কথা বলে ফজরের আযানের পর ঘুমোতে যাওয়া প্রেমিক ঘুমের ঘোরেই বিভিন্ন মন্তব্য শুরু করে। বাদ যায়না রাত বারোটায় ঘুমিয়ে ফজরের নামায করে আবার ঘুমোতে যাওয়া নামাযী ছেলেটিও।
তবে সবার মন্তব্যের মধ্যে একটা জায়গায় মিল আছে। সেটা হল সবার মন্তব্য শুরু হয় সুপরিচিত,হয়ত ক্যাম্পাসে সবচেয়ে ব্যবহৃত শব্দটি দিয়ে। শব্দটি ব্যবহার করতে করতে এটাকে আর ‘অপবচন’ বলে মনে হয়।তাই নামাযী ছেলেটিও নির্দ্বিধায় এই শব্দ ব্যবহার করে। ‘এক দেশের বুলি, আরেক দেশের গালি’ এই প্রবাদের উদাহরণ দিতে কাউকে কষ্ট করে শব্দ বের করতে হবেনা।
ঘুমের দেবতা আস্তে আস্তে পরাজিত হতে শুরু করেন।
৭ টা ৪০ মিনিট। ঘাস খাওয়া অবস্থায় হরিণ যেমন হিংস্র প্রাণীর শব্দ পেয়ে তাড়াহুড়ো করে গলা তুলে চারিদিকে তাকায়, অনিকেতও তেমন তাড়াহুড়ো করে লাফ দিয়ে ঘুম থেকে উঠে বসে। তার চোখে ঘুম, সংশয়, ভয়, বিরক্তির ছাপ। তবুও সে দেয়ালে হেলান দিয়ে কিছুক্ষণ ঝিমায়।। আরো পাঁচ মিনিট চলে যায়। দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে হতাশ ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ায়। অনিচ্ছাসত্ত্বেও হেলে ধুলে উঠে দাড়ায় আর প্রশাসনের গুষ্ঠি উদ্ধার করতে থাকে। সকাল আটটায় ক্লাস থাকায় তার কাছে নিজেকে কিন্ডারগার্টেন মনে হয়।
হাওয়া ভর্তি বেলুনে একবার সুঁচ ঢুকালে যেমন সব হাওয়া বের হয়ে আসে তেমনি করে আটটার ক্লাসের মতো এক সমস্যাকে স্মরণ করে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল সমস্যাকে চোখের সামনে এনে মনের জানালা খুলে তুলোধোনা করতে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে প্রশাসনের স্বেচ্ছাচারিতা, ক্যান্টিনের খাবার, হলের সিট সংকট,শিক্ষকদের একগুঁয়েমি মনোভাব, ক্যাম্পাসের মধ্য দিয়ে অবাধে গাড়ি চলাচলসহ বিভিন্ন সমস্যা। নতুন করে যুক্ত হয়েছে ‘সাত কলেজ সমস্যা’। বহিরাগতদের অবাধ প্রবেশের জন্য অনিকেতসহ অনেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিদ্রূপ করে বলে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পার্ক’।
গণরুমের বাসিন্দাদের ক্লাসে যাওয়ার পোশাক আর ঘুমানোর পোশাক একই হয়। তবে কেউ কেউ ঘুমানোর পূর্বে বাংলার ঐতিহ্যবাহী পোশাকটিকে ঘুমানোর পোশাক হিসেবে ব্যবহার করেন। তবে যারা অনিকেতের মতো তাদের কোন রাতের পোশাক থাকেনা। কারণ সকালে ক্লাসে যেতে যেতে এমনিতেই দেরী হয়ে যায় তার উপর পোশাক পরিবর্তনের জন্য আলাদা সময় অপচয় করার কোন মানে হয়না। প্যান্ট পরাই আছে শুধু শার্টটা লাগালেই হল। অনিকেত তাই করলো। ব্রাশে টুথপেস্ট নিতে গিয়ে দেখে টুথপেস্ট এর টিউব অনাহারে হাড্ডিসার অবস্থা। নতুন টুথপেস্ট কিনবে কিনবে করে আর কেনা হয়না। অনিকেতের দৃঢ় বিশ্বাস কিছুক্ষণ সাধনা করলে এই টিউব থেকেই কিছু বের করা সম্ভব। অনেক্ষণ টিপাটিপি করে সে তার সাধনার ফল পায়। তার ঠোঁটে প্রাপ্তির হাসি ফুটে ওঠে। শাক্যমুনি এত বছর সাধনা করে যখন বোধিলাভ করেন তখন তিঁনিও হয়ত এমন প্রাপ্তির হাসি দিতে পারেননি।
ব্যাগ গুছানোর কিছু নেই। ক্লাসের জন্য যা দরকার তা সবই ব্যাগে আছে। এই ব্যাগ হলে এসে আর খোলা হয়না। সে শুধু পরিক্ষার পূর্ব রাতে এর চেইন খোলার প্রয়োজন মনে করে।
কাঁধে ব্যাগ আর হাতে ব্রাশ নিয়ে সে বের হওয়ার জন্য তৈরি হল। ব্রাশ হাতে বের হওয়ার মধ্যেও সময় বাঁচানোর গল্প আছে। আসলে চারতলা থেকে নামার জন্য যে সিঁড়িটা আছে তা অনিকেতের রুম থেকে অনেক দূরে। আর সিঁড়ির সাথেই ওয়াশরুম। এতদূরে দাঁত ব্রাশ করে আবার রুমে ফিরে যেতে যে সময় লাগে আটটার ক্লাসের পূর্বে তা কমপক্ষে একযুগ মনে হয়। তাই সে একেবারে ব্রাশ নিয়েই রুম থেকে বের হয়ে যায়। আর প্রকৃতির টানে যে কাজটি করতে হয় তার সময় প্রকৃতিকে বলেকয়ে সে পরিবর্তন করে নিয়েছে।
রুম থেকে বের হয়ে সুমনের চোখে, মাথায় আগুন জ্বলতে থাকে। জুতা নেই।
গণরুমের এই এক সমস্যা। এখানে ব্যক্তিগত কোন সম্পত্তি নেই। সমাজতান্ত্রিক পরিবেশ বিদ্যমান। একজনের জিনিস আরেকজন ব্যবহার করবে। কেউ বলে করে আর কেউ না বলে। যখন কোন জিনিস পাওয়া যায়না তখন এই সমাজতন্ত্রকে সমস্যা মনে হয়। তবে দিনশেষে এই সমস্যার নাম হয় ভালোবাসা। সকালের ক্লাসের জন্য রাতে একটি শার্ট ইস্ত্রি করে রাখা হলে সকালে উঠে দেখবে এই রুমের কেউ একজন সেটা পরে ক্লাস করতে চলে গেছে কিংবা প্রেমিকার সাথে ঘুরতে গেছে। প্রতি সেমিস্টারে যে ভাইভা পরিক্ষাটি হয় তখন সবাইকে ফরমাল পোশাকে সাহেব সাজতে হয়। তখন কারো পোশাক না থাকলে কোন গণরুমবাসীকে চিন্তা করতে হয়না। কারোর টাই আছে, কারোর জুতা আছে আবার কারোর শার্ট আছে এভাবে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। সেই ভাইভা পরিক্ষার্থীর পোশাকের যোগানদাতা খুঁজলে দেখা যাবে টাই দিয়েছে নেত্রকোনার একজন, শার্ট দিয়েছে সিলেটের একজন, জুতা দিয়েছে চাঁদপুরের একজন, প্যান্ট দিয়েছে ময়মনসিংহের একজন, স্যুট দিয়েছে কিশোরগঞ্জের একজন। কে বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গরীবের বিশ্ববিদ্যালয়? ধনী-গরীব নির্ণয়ের মানদণ্ড কি শুধুই অর্থ?
অনিকেত রেগে টমেটোর মতো হয়ে গেছে। রুমে ঢুকে জিজ্ঞাস করল, ” আজ সকালে ক্লাসে কে গেছে কেউ দেখছিস?” অনিকেতের প্রশ্নের জবাব আসেনি। তার মনে হচ্ছে সে মহাশূন্যে অবস্থান করছে। তার কথা মাধ্যমের অভাবে কারো কানে পৌঁছাতে পারছেনা। অনিকেতের রাগের পরিমাণ দ্বিগুণ হল।তবে এখন আর রেগে লাভ নেই। রাগ করলে কাকতালীয়ভাবে জুতা পাওয়ার মধ্যে সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে কিন্তু তার জবাবের উত্তর পাওয়ার সম্ভাবনা সরিষা পরিমাণও নেই। দ্রুত সময় চলে যাচ্ছে তাই সে আরেকজনের জুতা নিয়েই ক্লাস করতে চলল।
ক্লাসে আসতে আসতে ৮টা ১০ মিনিট বেজে গেছে। ক্লাসরুমের কাঁচের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে শিক্ষক লেকচার দিচ্ছেন। সুমন তাড়াহুড়ো করে ক্লাসে প্রবেশ করে যেন ক্লাস করতে তার খুব ভালো লাগে,খুব সমস্যার জন্য দেরি হয়ে গেছে। সুমন পিছনের বেঞ্চের চেয়ে কয়েক বেঞ্চ সামনে বসে। এর মধ্যে সুমনের ব্যক্তিগত একটি থিওরি আছে। সে মনে করে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের নজর থাকে প্রথম বেঞ্চে আর শেষ বেঞ্চে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য সুযোগ পাওয়া প্রায় প্রতিটি শিক্ষার্থীই কলেজ পর্যন্ত প্রথম বেঞ্চের অধিপতি ছিল। কিন্তু এখানে এসে অনেকেই ব্যাকবেঞ্চার হতে প্রতিযোগিতায় নামে। সামনের বেঞ্চগুলো খালি থাকতে পারে কিন্তু পিছনের বেঞ্চে ৫ জনের জায়গায় সাতজন বসবে। কিন্তু সুমন একদম পিছনের বেঞ্চেও বসবেনা সামনের বেঞ্চেও বসবে না। ব্যাক বেঞ্চ থেকে কয়েক বেঞ্চ সামনে বসলে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রশ্নে সাধারণত বিব্রত হতে হয়না। তাছাড়া শুধু মাত্র ‘এটেন্ডেন্স’ এর জন্য ক্লাসে এসে শিক্ষকের রসহীন বকবক শুনে কানের পর্দাকে যন্ত্রণা দেওয়ার মানেই হয়না। তাই সে পুরো ক্লাসের সময়টা ঘুমিয়ে কাটায় শুধু নাম প্রেজেন্টের সময় কচ্ছপের মতো মাথা তুলে ‘ইয়েস স্যার’ বলে।
আজকের ক্লাসেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ক্লাস শেষে নাস্তা করার জন্য সে সরাসরি কোন ক্যান্টিনে না গিয়ে সূর্যসেন হল ক্যাফেটেরিয়ার সামনে খোলা জায়গাটিতে কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরি করে। এর পিছনে তার বিশাল একটি পরিকল্পনা কাজ করে। এই কাজটি সে সাধারণত মাসে শেষ দিকের দিনগুলোতে করে থাকে। পরিকল্পনাটি হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় ভাইদের সামনে কিছু খাওয়া মানে এর বিল পরিশোধ করা বড় ভাইদের ফরয দায়িত্ব। আবার সকাল, দুপুর, বিকাল এই সময়ে কোন জুনিয়রকে ক্যাফেটেরিয়া বা কোন দোকানের সামনে দেখলে তাদেরকে কিছু খেতে অফার করাও দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। বড় ভাইয়েরা এই দায়িত্ব সবসময় পালন করে তা বলা যাবেনা তবে প্রায়ই করে। মাস প্রায় শেষ। অনিকেতের পকেটে তীব্র খরা চলছে। তাই বাধ্য হয়েই ক্যাফেটেরিয়ার সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। যদি কোন বড় ভাই ক্যাফেটেরিয়ায় ঢুকে তাহলে সেও তার পিছু পিছু প্রবেশ করবে। কয়েক মিনিট পরেই দেখলো বঙ্গবন্ধু হলের সৌদ নামের এক বড় ভাই ক্যাফেটেরিয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ক্যাফেটেরিয়ায় ঢুকে গেলে আর সালাম দেওয়া যাবেনা। তাই সে দৌড় দিয়ে সেই ভাইয়ের পিছন থেকে উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলল, ” আসসালামু আলাইকুম, ভাই।”
সৌদ: ওয়ালাইকুম সালাম। কি রে অনিকেত কী অবস্থা?
অনিকেত: এইতো ভাই আলহামদুলিল্লাহ।
সৌদ: নাস্তা করছিস?
অনিকেত মনে মনে বলল আপনি নাস্তা করাবেন বলেই তো এখানে অপেক্ষা করছিলাম। সে উত্তর দিল: না ভাই করিনাই। মাত্র ক্লাস শেষ করে আসলাম।
সৌদ: আচ্ছা আয় তাহলে খাই।
অনিকেতের কাছে এটা অনুমেয় ছিল। বড় ভাইয়ের সাথে ক্যাফেটেরিয়ার সামনে দেখা হবে আর খেতে বলবেন না এমনটা হবেনা।
সৌদের সাথে যখন বসে যখন নাস্তা করছিল তখনই অনিকেতের ফোন বেজে উঠলো। তার গণরুমের বন্ধু নকিব ফোন করেছে। নকিবের ফোন তার মানে পলিটিকাল প্রোগ্রাম আছে। সে রাজনীতিতে ব্যাপক সরব। পলিটিকাল প্রোগ্রাম হলেই প্রথম বর্ষের সাথে দ্বিতীয় বর্ষের সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে এই নকিব। দ্বিতীয় বর্ষের কেউ একজন নকিবকে বলবে প্রোগ্রাম আছে আর সে এই দায়িত্ব খুব গুরুত্বসহকারে পালন করে। সাধারণত প্রোগ্রাম ব্যতীত সে কাউকে ফোন দেয়না। রাজনীতির প্রতি প্রবল আগ্রহ বলে গণরুমে তাকে ডাকা হয় ‘নেতাজী’। শুধু নকিব না গণরুমের প্রতিটা বাসিন্দাকে তার কর্মকাণ্ড, গুণ, আগ্রহের ভিত্তিতে চমৎকার ডাকনাম দেওয়া হয়। কেউ বেশি ঘুমায় বলে ঘুমের রাজপুত্র, কোন একজনের প্রেমের বিচ্ছেদ ঘটেছে বলে তার নাম হয়ে যায় ‘বাপ্পারাজ’, কেউ অনেক মজা করতে পারে বলে তার নাম দেওয়া হয় মি. বিন। আবার কেউ দেখতে সুপুরুষ বলে তার নাম হয়ে যায় ‘ক্যাটরিনা’। দুজন বন্ধুর অনেক মিল বলে তাদের একত্রে ডাকা হয় ‘রাজ্জাক-কবরী। এভাবে লেখক, বুদ্ধিজীবী, গায়ক, কোকিল কন্ঠী, নারী বিশারদ, মাওলানা তাহেরি এমনকি পর্ণস্টারদের নামও ডাকনাম হয়ে যায়। গণরুমে দিন যেদিন শেষ হয়ে সেদিন এই নামগুলোই বিবর্ণ দেয়ালে তাদের স্মৃতি বহন করে। এছাড়া গণরুমের দেয়ালের মতো ‘চিকা মারা’ আর কোথাও হয়না। এখানে লেখা থাকে কোন মনীষীর বিখ্যাত উক্তি, গণরুমে ঘটে যাওয়া কোন মজাদার ঘটনা। তবে এখানে অশ্লীল বাক্যের রাজত্ব বিদ্যমান।
সৌদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে সে ফোন ধরে বলল, “প্রোগ্রাম আছে?”
নকিব, “হ্যা, দশ মিনিটের মধ্যে ভাইয়েরা আসতে বলছে।”
প্রোগ্রামে ঠিক সময়ে উপস্থিত হবে এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফোন কেটে দেয়।
মধুর ক্যান্টিনে প্রোগ্রাম। প্রথম বর্ষের কাছে প্রোগ্রামের সময়টা হল আড্ডা দেওয়ার, মজা করা। আবার কারো কারো কাছে বিরক্তিকরও। ক্যান্টিনের সামনে যে গাছগুলো আছে সেগুলো প্রথম বর্ষের ছেলেদের প্রতি নীরবে কৃতজ্ঞ প্রকাশ করে। কারণ প্রথম বর্ষের ছেলেদের রসপূর্ণ কথার জন্যই ওরা একটু বিনোদন লাভ করতে
পারে।
অনিকেতের রুমে ‘কিং অব গুজব’ নামে পরিচিত রবিন আবিরকে বলছে, “গত রাতে কানে ফোন ধরে কার জন্য কান্না করছিলি?”
সবাই এক সাথে হেসে উঠলো। সবার দৃষ্টি তখন আবিরের দিকে।
তখন অশ্লীল বালক নামে খ্যাত সোহেল বললো,”ভাবি, আদর সোহাগ করেনি নাকি?”
অনিকেতে সোহেলের কথার সাথে যোগ দিয়ে বললো, “কিভাবে আদর করবে বল? ওর শরীরে যা গন্ধ না! কাছেই তো ভিড়া মুশকিল”
আবারো হাসির শব্দ। মধুর ক্যান্টিনের সামনে অবস্থানরত সবাই তাদের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিল। তবে তারা কেউই সেই দৃষ্টিকে কোন পাত্তাই দিল না।
গণরুমের যে কয়টি ছেলে দেখতে চমৎকার, মার্জিত, পরিষ্কার তার মধ্যে আবির অন্যতম। অনিকেত যে কথাটি বলেছে তা শুধু মজা করার জন্যই। রবিনের কথাটিও মিথ্যা। আবিরের কোন প্রেমিকা নেই। এজন্য সে খুব হতাশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার আগে ভেবেছিল যদি চান্স পায় তবে তার পিছনে প্রেমিকার লাইন সৃষ্টি হবে। কিন্তু হায়! কোথায় প্রেমিকা? কোথায় লাইন? তার পিছনে লাইন ধরা তো দূরের কথা সে লাইনেও দাঁড়িয়েও কোন সুফল পায়নি।
গণরুমবাসী মজা করার জন্য যখন কিছু পায়না তখন গুজব ছড়িয়ে হলেও মজা করার পরিবেশ সৃষ্টি করবে।আর আবির যদি কান্না করতো তবুও তা কেউ গোপন রাখতো না। কারণ গণরুমে গোপনীয়তা বলতে কিছু নেই।
আবির উত্তর দিল, ” প্রিয়াঙ্কা চোপড়া যখন আমাদের দেশে আসে তখন আমি এত মানুষের জন্য তার কাছে যেতে পারছিলাম না। দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম কিন্তু একটা কথা আছে ‘রতনে রতন চিনে, শুয়োরে চিনে কচু’। সে দূর থেকে আমাকে দেখেই চিনেছে আমার মধ্যে কী আছে। তাই আমাকে ডেকে নিয়ে জড়িয়ে ধরেছিল। আর কী বলেছিল জানিস?
সবাই এক সাথে প্রশ্ন করে, “কী বলেছিল?”
আবির বলে, ” আমাকে বলেছিল, You are so cute dear. Enchanting smell.”
সবাই একসাথে হো হো করে হেসে উঠলো। সবাই জানে এটা মিথ্যা গল্প। সেটা দেখার বিষয় না, মজা পেয়েছে সেটাই বড় বিষয়।
আকাশ বললো, “এটা নিয়ে তুই গর্ব করছিস? ছিঃ! প্রিয়াঙ্কা যে তোকে মেয়ে বানিয়ে গেল সেটা বুঝিস নি? কিউট কারা হয় জানিস? মেয়েরা। আর সুঘ্রাণ মেয়েদের হয় ছেলেদের না।”
আকাশ অনিকেতের রুমের সবচেয়ে রসিক ছেলে। তার ঠোঁটের ডগায় রসপূর্ণ বাক্য সবসময় প্রস্তুত থাকবে। সে সেই বাক্য ছুঁড়বে আর কেউ হাসবে না এমন হতে পারেনা। যে হাসবে না সে রোবট অথবা জড়।
সবাই যখন এক সাথে আড্ডা দেয়, মজা করে তখন অনিকেত খুব মুগ্ধ হয়। দিনে পাঁচশো টাকা খরচ করে এমন ছেলে যেমন এই রুমে আছে তেমনি সত্তর টাকা দিয়ে দিন চলে এমন ছেলেও আছে। কিন্তু এই রুমে সবাই এক, কোন বৈষম্য নেই। কত কথা হয়, কত ঝগড়া হয় কিন্তু অর্থের অহম নিয়ে কথা বলেছে এমন কাউকে সে দেখেনি।
দুই ঘণ্টা প্রোগ্রাম করে সবাই হলে ফিরেছে। অনিকেত গোসল করে ঘুমোতে যায়। বিকাল পাঁচটার দিকে সবার চিল্লাচিল্লিতে ঘুম ভাঙে। রুমে আনন্দঘন পরিবেশ।
চোখ কচলাতে কচলাতে অনিকেত উঠে বসে। তখনই রুমে গায়ক রকিব তার দিকে লক্ষ্য করে বলে, ” সাবধান, হুশিয়ার! শাহজাদা অনিকেত ঘুম থেকে উঠেছেন। সাবধান!”
রুচিশীল আনন্দ করতে কারোর বাঁধা নেই। তাই পাঞ্জাবী পায়জামা পরিহিত হুজুর ছেলেটি বাদ যাবে কেন? এই রুমের মোল্লা নামধারী ছেলেটি বলল, “আহা! শাহাজাদা। এমন ঘুমই ঘুমায় যে চারতলা থেকে ফেলে দিলেও তার ঘুম ভাঙ্গবে না।”
অনিকেত হেসে হেসে বললো, “ভাঙ্গবে কী করে? আমি তো শুধু রাজ্য পরিবর্তন করব।”
হঠাৎ রুম নীরব হয়ে গেল। যেন হঠাৎ ঝড় থেমেছে। সবার চোখে প্রশ্ন আর বিস্ময় দৃশ্যমান। অনিকেত খুব মজা পেল। মানুষকে অবাক করার মধ্যে এক ধরণের মজা আছে। তার চেয়েও মজা একজন কৌতুহল হয়ে কিছু জানতে প্রশ্ন করেছে কিন্তু তার উত্তর না দেওয়া। উত্তর দিয়ে দিলে কৌতুহলের মৃত্যু ঘটে। মাঝেমাঝে কৌতুহল বাঁচিয়ে রাখার মধ্যে আলাদা সুখ পাওয়া যায়।
মুচকি হাসি দিয়ে সে ওয়াশরুমে চলে গেল। রুমে ফিরে দেখলো সেই নীরবতা আর নাই। বেশ আলোচনা চলছে। অনিকেত নীরব শ্রোতা হয়ে সেসব শুনতে বসে পড়লো। সে অবাক হয়ে শুনে কত ধরণের সৃজনশীল মতামত এসব আলোচনায় উঠে আসে। কে কতটুকো সুন্দর মতামত প্রদান করেছে, কে কতটুকো জানে এসব নিয়ে কোন নাম্বার প্রদান না করা হলেও মনে মনে একটি প্রতিযোগিতা কাজ করে। একেকদিন একেক বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। পর্ণোগ্রাফি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে কিন্তু দেখা যায় সেই আলোচনা দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থা হয়ে ধর্মীয় অবস্থায় গিয়ে শেষ হয়। কিভাবে যে এমন হয় তা কেউই ভেবে কূল পায়না। আলোচনায় হঠাৎ কেউ বলে উঠবে চল চাঁদপুর ঘুরে আসি।কেউ দ্বিমত করবে না। সেদিনই রওনা হয়ে যাবে চাঁদপুরের উদ্দেশ্যে। এই গণরুমে না থাকলে যৌবন কী, আঠার বছর বয়স কী তা কখনোই অনিকেতের পক্ষে এতটা উপলব্ধি করা সম্ভব হতো না।
আজকের আলোচনার মাঝখানে আকাশ হঠাৎ দাঁড়িয়ে বলল ” লেডিস এন্ড জেন্টেলম্যান, ও সরি এখানে তো লেডিস নেই। তবে আবিরের জন্য বলাই যায়।যাই হোক দরকারি কথাটি বলে ফেলি, একটি বিশেষ ঘোষণা আজ আমাদের বিখ্যাত মৃগী রোগী জনাব ফাহিম সাহেবের জন্মদিন। আজ রাত ৯ঘটিকায় আমরা তার জন্মদিন উদযাপন করব এবং তার আত্মার মাগফিরাত… আবারো দুঃখিত! আমরা তার দীর্ঘায়ু কামনা করে দোয়া করব। জন্মদিন সুষ্ঠুভাবে উদযাপন করতে বাধ্যতামূলক মাত্র ত্রিশ টাকা চাঁদা ধার্য করা হয়েছে। তাই সবার প্রতি বিনীত অনুরোধ ত্রিশ টাকা প্রদান করার মাধ্যমে দাওয়াত গ্রহণ করুন। সবাই হাত তালি দেন।” হাত তালি ও হাসি বিচিত্র একটি শব্দ তৈরি করলো।
মাস প্রায় শেষ। অনিকেতের হাতে তেমন টাকা নেই। সে জানে প্রায় সবারই একই অবস্থা। তাই বলে জন্মদিন উদযাপন থেমে থাকবে? তা হয়না। পরে ধার করে চলা যাবে কিন্তু জন্মদিন চলে গেলে আর পালন হবেনা। তাই অর্থসংকটে থাকলেও সবাই চাঁদা প্রদান করে।
অনিকেত আকাশের কাছে টাকা দিয়ে টিউশনির জন্য বের হয়ে গেল। টিউশন মিরপুর ১ নাম্বারে। এক ঘণ্টার টিউশনের জন্য ৩ ঘণ্টা সময় ব্যয় হয় যাতায়াতে। সে মনে করে ঢাকা শহরে যদি যানজট না থাকতো তাহলে হয়ত এই শহরকে স্বর্গ বলা যেতো। তবে তখন এই শহরের অন্য সমস্যাগুলো বেশি চোখে পড়বে। অনিকেত খুব অবাক হয় এই শহরে অগণিত সমস্যা কিন্তু এই শহর ছেড়ে যেতে কারোরই মন চায়না। তার নিজেরও ভালো লাগেনা। এজন্য চিরকুট ব্যান্ডের ‘জাদুর শহর’ গানটিকে স্বার্থক মনে হয়। টিউশনিতে যে শুধু যাতায়াত সমস্যা তা না, অনিকেত শুনেছে একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রকে টিউটর হিসেবে পেয়ে অভিভাবকরা খুব খুশি হতেন টিউটরদের সম্মান ছিল যথেষ্ট। কিন্তু এখন ছাত্রের চেয়ে টিউটর বেশি। এখন একটি টিউশনি পাওয়া মানে সোনার হরিণ পাওয়া। এটি এখন একটি বড় বাজারে পরিণত হয়েছে। এখন কেউ টিউটরদের শিক্ষক মনে করে না। ছাত্রের বাবা খুব কম কথাই বলেন, দেখাও হয়না। তবে ছাত্রের মা প্রায়ই খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে কথা বলবেন।
অনিকেত যে ছাত্রটিকে পড়ায় তার নাম রুদ্র। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। তার মা একদিন এসে বললেন,”আপনি তো ভালোই পড়াচ্ছেন, কিন্তু কেন যে গণিতে ৯৭ পেয়েছে! আপনি এক ঘণ্টা পড়ানোর কথা কিন্তু ৪৫/৫০ মিনিট পড়িয়ে চলে যান। এটা ব্যাপার না। তাড়া থাকতেই পারে।তাছাড়া এই সময়টা কম কিসে?”
অনিকেত শান্তস্বরে উত্তর দেয়, “আমি আরেকটু চেষ্টা করব।”
ভদ্রমহিলা ইউটার্ন নিয়ে তার রুমে যায়। শুধু যে ছাত্রের অভিভাবকই অসম্মান করেন তা না। ছাত্রও করে। বরং বেশিই করে। আরে সেটা অসম্মানের পাশাপাশি খুব বিব্রতকর হয়। একদিন রুদ্রকে পড়ানোর সময় তার মা নাস্তা দিয়ে যান। সেদিনের নাস্তা সচরাচর যেমন দেয় তেমন ছিল না। বিত্তশালীরা দামী নাস্তা করে থাকলেও টিউটরদের জন্য স্বল্পমূল্যের নাস্তা কিনে রাখেন। সেদিন এক গ্লাস জুস, একটি সাগর কলা, একটি আপেল, দুইটি আটার রুটি, একটি ঝাল ফ্রাই দেখে অনিকেতের চক্ষুচড়ক গাছ অবস্থা।
আজ এত ভালো নাস্তা কেন এই প্রশ্ন তার মনে বারবার উঁকি দিচ্ছে। তখন আবার ভাবলো কী দরকার কারণ খুঁজে? এসব খুঁজতে গেলে খাবারের মজাই নষ্ট হয়ে যাবে। অনিকেত তৃপ্তির সাথে সবগুলো খাবার নিশ্চিহ্ন করে দিল। মূল কাহিনী ঘটলো তখনই। অনিকেতের খাওয়া শেষ হওয়ার সাথে সাথেই রুদ্র তার মা কে ডেকে বললো, “মা, স্যারের নাকি জুস খেতে ভালো লেগেছে। স্যার আরো এক গ্লাস চাচ্ছেন।” এমন পরিস্থিতিতে অনিকেতের হাতে বিষের শিশি থাকলে আজ হয়ত সে বেঁচে থাকতো না।
টিউশনের টাকা দিয়ে অনিকেত যখন একটি শার্ট কিনে তার বাবাকে উপহার দেয় তখন তার বাবার হাসিটা দেখে তখন এসব অপমান, কষ্ট সে এক নিমিষেই ভুলে যায়।
রাত ৮:৩০ মিনিটে অনিকেত হলে ফিরে খাওয়াদাওয়া করে রুমে এসে দেখে উৎসবমুখর পরিবেশ। জন্মদিন পালনের তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। গায়ক রকিব গান শুরু করে,
“আজকের আকাশে অনেক তারা
দিন ছিল সূর্য্যে ভরা
আজকের জোছনাটা আরো সুন্দর
সন্ধ্যাটা আগুন লাগা
আজকের পৃথিবী তোমার জন্য
ভরে থাকা ভালো লাগায়
মুখরিত হবে দিন গানে গানে
আগামীর সম্ভাবনায়
তুমি এইদিনে পৃথিবীতে এসেছো
শুভেচ্ছা তোমায়
তাই অনাগত ক্ষণ হোক আরো সুন্দর
উচ্ছ্বল দিন কামনায়
আজ জন্মদিন তোমার।।”
রাত নয়টার দিকে ফাহিমের জন্মদিনের কেক কাটা হয়। আকাশ বলেছিল কেক কাটার পর দোয়া হবে। কিসের দোয়া! কেক কাটার সাথে হইহুল্লোড়, নাচে,গানে, আনন্দের বন্যায় প্লাবিত হয়। পাশের রুমে বিসিএসের জন্য পড়াশোনায় মগ্ন ভাইটি এসব হইহুল্লোড়, বেসুরো কন্ঠে গান শুনে বিরক্ত হোন না বরং মনের অজান্তেই বলে উঠেন, “আহা! আবার যদি প্রথম বর্ষে ফিরে যেতে পারতাম।”
রাত ১০:৩০ মিনিটে গেস্টরুম আছে। গেস্টরুম এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম একটি ঐতিহ্য। যেখানে হলের দ্বিতীয় বর্ষের সিনিয়র ভাইয়েরা এসে ক্যাম্পাসে চলার জন্য প্রয়োজনীয় ‘ম্যানার’ শেখায়। এটা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। কেউ এটিকে ইতিবাচকভাবে দেখেন আবার কেউ দেখেন নেতিবাচকভাবে।
বড় ভাইদের জন্য অনিকেতসহ সবাই যখন গেস্টরুমে অপেক্ষা করছিল তখন ফাহিম অনিকেতকে বলে “দোস্ত, আমার শরীরটা কেমন জানি করছে, শ্বাস কষ্ট হচ্ছে।”
অনিকেত কোন উত্তর দেওয়ার আগেই ফাহিম অজ্ঞান হয়ে সোফা থেকে পড়ে যায়। সবাই ফাহিমের অজ্ঞান দেহটিকে ঘিরে ধরে। সবার চোখে-মুখে ভয়, সংশয়। সবাই ফাহিমকে গেস্টরুম সংলগ্ন ওয়াশরুমে নিয়ে যায় মাথায় পানি দেওয়ার জন্য। কেউ পানি দিচ্ছে, কেউ হাতের তালু পায়ের তালুকে হাত দিয়ে ঘষে উষ্ণ করার চেষ্টা করছে। নকিব এতক্ষণে বড় ভাইদের ফোন করে জানিয়ে দিয়েছে। কিছুক্ষণ পরেই কয়েকজন বড় ভাই এসে উপস্থিত হয়। তখন ফাহিমের কিছুটা জ্ঞান ফিরে। একজন বড় ভাই বলেন, “তোরা হেটে হেটে আয় আমি আর অনিকেত রিক্সায় করে ফাহিমকে মেডিকেল নিয়ে যাচ্ছি।” সেই ভাই ও অনিকেত ফাহিমকে রিক্সা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। অন্যরা রিক্সার পিছু পিছু হাঁটা শুরু করে।
ফাহিমের অসুস্থতা নতুন কিছু নয়। তবে কোনদিন অজ্ঞান হয়নি আজই প্রথম ঘটলো। সে প্রায়ই অসুস্থ বলে তার ডাকনাম মৃগী রোগী।
ফাহিমকে নিয়ে মেডিকেলে পৌছার কিছুক্ষণ পরই অন্যরা এসে পৌছেছে। ডাক্তার রোগীকে দেখে ভর্তি করা পরামর্শ দিয়েছেন। বড় ভাইয়েরা ভর্তির ব্যবস্থা করে, দুই লিটার জুস, কয়েক প্যাকেট চিপস দিয়ে হলে ফিরে গেছেন।
একটু আগেই যেই ছেলেগুলো আনন্দের সমুদ্রে ডুবে ছিল সেই ছেলেগুলোই এখন চিন্তার সমুদ্রে ডুবে আছে। গণরুমে মন খারাপ থাকার কোন সুযোগ নেই। গণরুমে প্রতিটি বাসিন্দার মুখে সবসময় হাসি লেগে থাকে। তাদের সাথে বাহিরের কেউ একদিন থাকলে যাবার সময় জসীমউদ্দীনের মতো তাকে বলতেই হবে, ‘এত হাসি কোথায় পেলে?’ কিন্তু এখন সেই ছেলেগুলোর চোখে মুখে বিষাদের ছাপ স্পষ্ট দৃশ্যমান।
আজ রাতে অনিকেতসহ কারোরই রুমে ফেরা হবেনা। সবাই হয়ত সারারাত নির্ঘুম থাকবে, কেউ বসে বসে ঘুমে মাথা দোলাতে দোলাতে আবার জেগে উঠে ফাহিমের মাথায় হাত রাখবে।
অনিকেত মেডিকেলের বারান্দায় একটি চেয়ারে বসে আছে। আকাশে প্রকাণ্ড চাঁদ ঝলমল করছে। তার মনে হল চাঁদটা যেন তার দিকে চেয়ে একটি মুচকি হাসি দিল। অনিকেতের ইচ্ছে হল চাঁদকে প্রশ্ন করবে, “তোমার এই হাসি কি শুধু আমাদের জন্য?” সে প্রশ্ন করেনি। কী দরকার! সব প্রশ্ন করতে নেই, সবকিছু প্রশ্ন করে জানতেও নেই। এত অনেক কিছুর মূল্য কমে যায়।
আজ অনিকতদের গণরুম ফাঁকা। কেউ নেই। আজ মশা ও ছারপোকা বাহিনী টহল দিতে নেমে যখন কাউকে পাবেনা তখন তারা খুব অবাক হবেনা।

আরও খবর  অস্তিত্বের লড়াইয়ে জয়-পরাজয়ের ধারক : কালচক্র

কাজী ই সাকিব
শিক্ষার্থী ,দর্শন বিভাগ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়