প্রশ্ন ফাঁসের গল্প……

59

সকাল হলেই ইংরেজি প্রথম পত্রের পরীক্ষা ।দু’দিন ধরে কিছু পড়তে পারিনি অসুস্থতার জন্য।বাংলা প্রথম পত্র পরীক্ষা খারাপ হয়েছে ভেবে,দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষার আগের রাত্রে ঘুমাইনি।পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফিরতেই শরীর খারাপ লাগতে শুরু করে।সর্দি-জ্বরে আক্রান্ত হই।নাক-চোখ দিয়ে সারাক্ষণ পানি ঝরতে থাকে।তবে যে করেই হোক ভালো রেজাল্ট করতে হবে।আমি আর আমার এক বন্ধু একসাথে বসে পড়ছি ।পরীক্ষার হল আমাদের বাসা থেকে কিছুটা কাছে হওয়ায় পরীক্ষার কয়দিন ও আমার বাসায় থেকে পড়াশুনা করছে।ও চারদিকে খোঁজ খবর নিচ্ছে প্রশ্ন পাওয়ার জন্য।রাত প্রায় ১২ টা তখনও দেখলাম কোনো কাজ হচ্ছে না ।আমি কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়লাম।তাহলে কি উপায় হবে?ভাবলাম তাহলে রাজ ভাইয়াকে ফোন দেই ।উনি যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন যেভাবে হোক খোঁজ খবর নিলে কারো মাধ্যমে প্রশ্ন সংগ্রহ করে দিতে পারবেন।যে ভাবা সে কাজ সাহস করে ভাইয়াকে ফোন দিলাম,‘আসসালামুআলাইকুম,ভাইয়া কেমন আছেন ?ভাইয়া আগামীকাল তো ইংরেজি প্রথম পত্র পরীক্ষা প্রশ্ন কালেক্ট করে দিতে পারবেন?’ ভাইয়া এভাবে উত্তর দিল,‘ওসবের জন্য আমরা পড়ে থাকিনা,এখনো ঘুমাও না কেন?তোমার এ প্লাস পাওয়ার দরকার নেই ।তুমি যা পারো তাই লিখে এসো বলে রাগের চোটে ফোন কেটে দিল ।’
হতাশ হলাম।এমন সময়ে এক বন্ধু আমার পাশে থাকা বন্ধুকে ফোন করে বলল,‘ সিন প্যাসেজ টেলিভিশন এসেছে।৪৭ নাম্বার প্যাসেজ ১ থেকে ৪ নং প্রশ্ন এখান থেকে দিবে ।আর বাকিটা?আমি প্রশ্ন করলাম বন্ধুর কাছ থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে ।সকালে পাওয়া যাবে বলে ওপাশ থেকে জানালো।যাক কিছুটা চিন্তামুক্ত হলাম ।রাত তখন সাড়ে বারোটার উপরে ছিল।আমরা রাত প্রায় দুটো পর্যন্ত পড়ে ভালো ভাবে আয়ত্বে নিলাম।তারপরে ঘুমাতে গেলাম।

আবার সকাল ছয়টা বাজতেই এক বন্ধু মটরসাইকেল নিয়ে বাড়ির দরজার সামনে এসে বার বার ফোন দিচ্ছে।রিসিভ করে বাড়িতে নিয়ে আসলাম।আনসিন প্যাসেজ ,প্যারাগ্রাফ,উইথক্লু,উইথআউটক্লু ,ম্যাচিং কোনটি কোনটি প্রশ্নে আসবে একে এক সব বলল।সাথে সাথে খুঁজে পড়া শুরু করলাম ।তিনজনে মিলে পুরোদমে পড়লাম ৯টা পর্যন্ত ।খাওয়া-দাওয়ার ও তেমন সময় পেলাম না ।পান্তা ভাত কোনোমতে পাঁচ মিনিটের ভিতর শেষ করলাম।

এদিকে আর একটি কাহিনী ঘটল ও কিভাবে-কোথায় প্রশ্ন পেল ?সুনিতা নামের এক বান্ধবী নাকি দিয়েছে ।সুনিতার ফোনে ব্যালেন্স রিচার্জ করে দিতে হবে।আর সুনিতার শর্ত হল কেউ এ বিষয়টি জানতে পারবেনা।কিন্তু এদিকে যে কি হচ্ছে তা তো সে জানছে না, মিঠুন কে যে প্রশ্ন দিয়েছে আর মিঠুন আমার বাসায়,আমরা একসাথে বসে ফাঁস করা প্রশ্নে প্রস্তুতি নিচ্ছি।আমাদের তিনজনের কারো ফোনে বিকাশ না থাকায়।মিঠুন হৃদয় নামের আর এক বন্ধুকে ফোন দিয়ে সুনিতার ফোনে ৫০ টাকা রিচার্জ করে দিতে বলল।কিন্তু হৃদয় ছিল খুব চালাক।টাকা রিচার্জ করে দেয়ার কারন বুঝতে পারল।টাকা রিচার্জ করে দিল ঠিকই কিন্তু সুনিতাকে ফোন দিয়ে পরীক্ষায় কি কি এসেছে জানতে চাইলো।সুনিতা সাথে সাথে মিঠুন কে ফোন দিল কেন, কেন সে অন্যকে বলেছে না বলতে বলার পরেও?মিঠুন কে ফোন রিসিভ করতে না দিয়ে আমিই রিসিভ করলাম।কারন সুনিতা আমার সাথে লাইন মারতে চাইত,অনেক চেষ্টা তদবির করত ।কিন্তু আমি কোনো পাত্তা দিতাম না। তাই আমি জানি আমি শত অন্যায় করলেও কিছু বলবেনা ।কিন্তু না, আমাকে বরং গালি দিল এবং মিঠুন কে ফোন দিতে বলল।আমি আর ফোন দিলাম না মিঠুনের হাতে ।আমরা বরং আমাদের কাজ করতে লাগলাম রিএ্যারেঞ্জ কোনটা এসেছে এ নিয়ে সন্দেহ থাকায় , যে কলমের কালি শেষ পর্যায়ে এরকম একটি কলম খুঁজে বের করে সাদা কাগজের উপরে দাগাতে শুরু করলাম ।একদিকে দাগাচ্ছি আর এক দিকে পড়ছি।একসময় যেটুকু কালি ছিল সব শেষ হল ।তারপর সে কলম দিয়ে প্রত্যেকের রেজিষ্ট্রেশন কার্ডের পিছনে সাদা অংশে চার থেকে পাঁচ টি রিএ্যারেঞ্জের উত্তর লিখে নিলাম।তারপর পরীক্ষার হলের দিকে রওয়ানা দিলাম ,সাথে বই নিয়ে নিলাম ।প্যারাগ্রাফ ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ এসেছে ,তাই ভালো করে সেটাকে আয়ত্বে নেয়ার চেষ্টা করলাম ,যাতে ১২ এ ১২ পাই।আমাকে অবশ্যই ভালো করতে হবে পরীক্ষায় কারন আমার এসএসসিতে এ প্লাস ।এখন যদি এ প্লাস না পাই লোকে হাসবে এবং অনেক মন্দ কথা বলবে ।বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষাতেও অনেক ঝামেলায় পড়ব ।এই ভেবে নাক চোখ মুচছি আর ভ্যানে বসেও পড়ছি।

যাক আল্লাহ যা করে ভালোর জন্য করে।এটাতে ৯০ এর উপরে মার্কস রাখতে পারলে দ্বিতীয় পত্রে ৭০ পেলেও এ প্লাস পাব।৯০ তো নিশ্চিত পাব।শুধু প্রশ্ন দিতে বাকি , সব সঠিক উত্তর দিয়ে চলে আসব।পরীক্ষার সময় শুরু হল, হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক খাতা দিলেন ,নাম রোল সব কিছু সঠিকভাবে ভরাট করলাম।পরীক্ষা শুরুর ঘন্টা পড়ল, শিক্ষক প্রশ্ন নিয়ে বেঞ্চের সামনে আসলে প্রশ্ন নিতে উঠে দাঁড়ালাম ।প্রশ্ন হাতে পেয়ে চুমু দিয়ে প্রশ্নপত্রের দিকে তাকালাম।

তারপরে ভাবলাম এ বছর আর পরীক্ষা দিব না ।তারপরেও বন্ধুদের অনুরোধে অনেক কষ্টে পরীক্ষা দিলাম। একটা কণা পরিমাণও কোনো প্রশ্ন বাঁধেনি।তারপর থেকে আর কখনো প্রশ্ন ফাঁসের পিছনে ছুটিনা ।অসুস্থতা থাকলেও যেটুকু পারি পড়াশুনা করার চেষ্টা করি। রাজ ভাইয়া কে সে সময় খারাপ লাগলেও এখন মন থেকেই শ্রদ্ধা করি।

লেখকঃ মুহাম্মদ হাসান মাহমুদ
শিক্ষার্থী,দর্শন বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়