নিশানরা সুন্দর আর ভালোবাসা দিয়ে বিশ্বজয় করে

103

আইনের ভয়,বিচারের ভয় দেখিয়ে আমরা অনেক কিছু অর্জন করতে চাই ।আমাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাই ।মানুষকে অনুগত হতে বাধ্য করতে চাই ।কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ঘটে ভিন্ন তা ।যার জন্য আইন যার জন্য নিয়ম শৃঙ্খলা-আমরা তৈরি করি তাদের প্রতি থাকে আমাদের প্রভুত্ব ভাব।

আমরা আমাদের নিজেদের স্বার্থে আইন তৈরি করি আবার অন্য কেউ এ আইনকে নিজেদের প্রয়োজনে ভঙ্গ করেন।আমার ভয়ে আমার সম্মূখে আইন ভঙ্গ না করলেও আমি যখনই আড়াল হব,আমার তৈরি আইনের জাহাজও আড়াল হয়ে যাবে ।এর এক বিন্দু পরিমাণ দামও তখন থাকবে না।

কিন্তু যারা নিজেদের প্রয়োজনে আইন ভঙ্গ করেন তাদের মাথার কাছে আমরা কখনো সুন্দরের আইন ঝুলিয়ে রেখেছি কি?রেখেছি কি ভালোবাসার আইন ?যা পড়ে শিখতে হয় না?বাধ্য হয়ে মানতে হয়ে না ?আপনা থেকে ভালোবাসা আর সুন্দরের আইনের প্রতি সবাই অনুগত ।সে যে হোক না কেন।

আর আমরা এ বিষয়টি খুব ভালোভাবে শিখেছিলাম নিশানের কাজ থেকে।যিনি পেশায় একজন সাধারণ রিক্সা চালক ছিলেন।যার সারা রাত কাটত নরম বিছানাহীন,লম্বা খাটবিহীন ছোট রিক্সায় গুঁজো হয়ে ঘুমিয়ে আর সারাদিন কাটত জীবিকা উপার্জনের তাগিদে রিক্সার চাকা ঘুরিয়ে।যিনি ছিলেন সুন্দরের পূজারী ।নিজের জীবনের চাকা সুন্দর না হলেও যিনি সুন্দরের আইন তৈরি করে গিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সীমানা প্রাচীরের (স্বাধীনতা সংগ্রাম ভাস্কর্য সংলগ্ন দেয়াল থেকে শুরু করে পলাশী পর্যন্ত) পাশে ছিল ময়লার স্তূপ মানুষজন প্রস্রাবের দরিয়ায় ভাসিয়ে দিত এ দেয়ালের পাশের ফুটপাতটিকে ।

দুর্গন্ধে মৃত মানুষের পক্ষেও হাঁটা অসম্ভব হয়ে পড়ত ।কিন্তু নিশান এ জায়গাটিকে ফুলের গন্ধে ভরে দিয়েছিলেন ।সুবাসিত করেছিলেন মানুষের অন্তর । তিনি প্রতিদিন শাহবাগ থেকে ফুল এনে ময়লাস্তূপে -মৃতে পরিণত এ দেয়ালের পাশটি সাজিয়ে রাখতেন কেউ আর তখন এ দেয়ালের পাশে প্রস্রাব করেনি,কেউ আর ময়লা ফেলেনি,বরং সবাই এখানকার ছবি তুলে-ভিডিও করে নিজেদের ফেইসবুক টাইমলাইনে-ইউটিউবে শেয়ার দিত তখন।

তখন আর এখানে প্রস্রাব করলে ২০০ টাকা জরিমানা আদায়ের বিধান কিংবা কাউকে মারধর করতে হয়নি। সৌন্দর্যের আইন যে সকলে আপনা থেকে গ্রহন করে। তাঁর চেতনায় ছিল দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ,মাতৃভূমির প্রতি অপার ভালোবাসা।তিনি সুন্দর করে ফুল দিয়ে লিখতেন বিভিন্ন জাতীয় দিবস কে কেন্দ্র করে ।তিনি শিল্পী ছিলেন,তিনি প্রেমিক ছিলেন ,তিনি মানুষ ছিলেন ।তিনি কখনো টাকার জন্য কাজ করতেন না ।কেউ তাকে টাকা দেয়ার কথা বললে তিনি ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করতেন।হয়ত আজ তিনি অন্যত্র কোথাও চলে গিয়েছেন শুধুমাত্র টাকা সাধার কারনে ।তিনি কখনো টাকার কাছে হার মানেন নি,টাকার কাছে নিজেকে বিক্রি করেননি।আমরা হয়ত বা আজ তাকে ভুলে গেছি।কিন্তু দেয়ালের পাশের সে পুরোনো দুর্গন্ধ আর বিশ্রী রূপ দেখলে নিশানের কথা মনে পড়ে যায়(এ ফুটপাতটিতে নতুন ব্লক দেয়ায় এখন কিছুটা কম,তবে দিন দিন আবার সে ময়লাস্তূপে-দুর্গন্ধে পরিণত হচ্ছে,তবে বিভিন্ন হলের সীমানা প্রাচীরের পাশে এরকম এখনো রয়েছে) ।বুকে আশা বাঁধে, নিশান আবার তাঁর সৌন্দর্য আর ভালোবাসার আইন নিয়ে সামনে এসে দাঁড়াবে।

আজ ধ্বংস স্তূপে পরিণত এ সমাজে নিশানদের খুব বড় প্রয়োজন ।যারা ভালোবাসা আর সুন্দরের সুভাস ছড়াবে সমাজে।প্রভু-দাসের শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে ,সাদরে বরণ করবে নিশানদের ছড়ানো ফুলের সুবাস ।মুক্তি পাবে ধ্বংসস্তূপ থেকে সমাজ।

লেখক:
মুহাম্মদ হাসান মাহমুদ ইলিয়াস
শিক্ষার্থী,দর্শন বিভাগ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আবাসিক শিক্ষার্থী ,স্যার এ.এফ.রহমান হল,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়