আকাশ সংস্কৃতি সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্ত

107

তথ্য প্রযুক্তির এ যুগে আকাশ সংস্কৃতি হলো আজকের বাস্তবতা। এটি ছাড়া আজকের বাংলাদেশ বলতে গেলে প্রায় অচল। সংস্কৃতি একটি জাতি ও রাস্ট্রের দর্পণ স্বরূপ।মানুষের দেশীয় জীবন আচরণ ই তার সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতির মাধ্যমেই একটি জাতি ও রাস্ট্র বিশ্বের দরবারে তাদের গৌরব ও ঐতিহ্যকে সম্মানের সাথে তুলে ধরতে পারে। কিন্তু বিশ্বায়নের কারণে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য নষ্ট হচ্ছে।

ইলেকট্রনিক ডিভাইস, ইন্টারনেট ও স্যাটেলাইট চ্যানেল গুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সাংস্কৃতিক আদান প্রদানই আকাশ সংস্কৃতি। আকাশ সংস্কৃতির প্রকটভাবে বিস্তার লাভের ফলে বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতির আদান প্রদান ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে উন্নত দেশের সংস্কৃতি ইন্ধন যোগাচ্ছে অনুন্নত দেশের মানুষকে। বিশেষ করে এদেশের তরুণ প্রজন্ম এতে বেশি করে প্রলুব্ধ হচ্ছে, দেশের সংস্কৃতি ভুলে বিদেশী সংস্কৃতির প্রতি ঝুঁকে পড়ছে। ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার এবং বিভিন্ন বিদেশী চ্যানেলে সময় ক্ষেপনের ফলে নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ, ধর্মবোধ, সামাজিকতার অবক্ষয় হচ্ছে। আমরা ভুলে যাচ্ছি আমাদের শিকড় কে।

ইসরায়েল এর উপর ইহুদিদের হামলার ভিডিও আমাদেরকে খুনি হতে উস্কানি দিচ্ছে। হিন্দি সিরিয়ালগুলোতে ছেলে মেয়েদের বিয়ের পূর্বে অনৈতিক মেলামেশার কাহিনী আমাদের কে লিভ টুগেদার এর মতো জঘন্য কার্যক্রমে লিপ্ত হতে সাহায্য করছে। মদ,গাজা, ইয়াবা, ফেন্সিডিল, শিসার মতো নেশা জাতীয় দ্রব্যের আগমন সেই পাশ্চাত্য সংস্কৃতি থেকেই। বিয়ের মতো পবিত্র সম্পর্কের প্রতি অনিহা এসেছে বিদেশী সংস্কৃতি থেকে। বিয়ের পর কুটনামি, দন্দ্ব, পারিবারিক কোলাহল এর জন্মদাতা এই পাশ্চাত্য সিরিয়াল। আমাদের সাংস্কৃতিক পোশাক সালোয়ার কামিজ, শাড়ি ছেড়ে আমরা মডার্ণ হয়েছি ছোট ছোট ছেঁড়া ও শরীর দেখানো পোশাক পরে, তাও আবার পাশ্চাত্য সংস্কৃতির কল্যাণে।

এই পাশ্চাত্য সংস্কৃতি আমাদের খাদ্যাভ্যাসকেও গ্রাস করেছে, করেছে মানসিকভাবে পরাধীন। এখন আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় পিজ্জা, বার্গার, পাস্তা না থাকলে কি মডার্ণ হওয়া যায়, সবাই তো খ্যাত বলবে, মান সম্মান এর প্রশ্ন!! যেসব ছেলে মেয়ে কোনদিনই নেশা জাতীয় দ্রব্য ছুয়েঁও দেখেনি, তাদেরকে এযুগে আঙুল উঁচিয়ে খ্যাত নামে ব্যাঙ্গ করা হয়। পাশ্চাত্য নাচ কে এখন এদেশের সংস্কৃতি হিসেবে গণ্য করা হয়। যেকোন অনুষ্ঠান এ কালচারাল পর্বে থাকে পাশ্চাত্য নাচ। এমনকি বিয়ে শাদিতে ও পাশ্চাত্য নাচ পারফর্ম করা কে ঘিরে রীতিমতো অনুশীলন চলে। সেখানে আমাদের দেশীয় গান এবং নাচ তাদের জায়গা হারাচ্ছে। আমরা ভুলে যাচ্ছি আমাদের ঐতিহ্য।

এখন যেকোন দিবস কে উৎযাপন করতে তরুণ সমাজ নাইট ক্লাবকে বেছে নিয়েছে। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব এতটাই বাজেভাবে পড়েছে যে বৃদ্ধ পিতামাতা এখন সংসারের বোঝা হয়ে যায়। তাদেরকে বৃদ্ধাশ্রমের মতো নরকে পাঠাতেও ইতস্ততবোধ করে না সন্তানেরা। পাশ্চাত্য সিরিয়াল এর সাথে তাল মেলাতে গিয়ে বাংগালী মেয়েরা তাদের স্বকীয়তা হারাচ্ছে। নিত্য নতুন সেলাই এর ডিজাইন, মেহেদীর ডিজাইন এবং রান্না করা যার শখ ছিল, সে আজকে কোন উপলক্ষ্য পেলে হিন্দী সিরিয়ালের মতো কিটি পার্টি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরে।

এখন নতুন একটি ট্রেন্ড খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সেটা হলো ছেলে বন্ধু। বিবাহিত ও অবিবাহিত মেয়ে- সবারই ছেলে বন্ধু চাই। বিবাহিত মেয়েরা এদিকে অনেক বেশি এগিয়ে আছে। ছেলে বন্ধু নিয়ে পার্টি করা, লং ট্যুর এ যাওয়া আর দেশের বাইরে ঘুরতে যাওয়া- এখনকার জনপ্রিয় কালচার। সংসার করা, সংসারের নিয়ম মানা ও সংসারের গন্ডি তে নিজেদের কে বাধঁতে অনিহা প্রকাশ করে এসব নারী সমাজ। এখনকার সমাজে বিয়ের পরে বাচ্চা নেয়ার প্রবণতাও কমে এসেছে। এসব কিছুই পাশ্চাত্য সাংস্কৃতিক আচরণ নিজেদের মনে গেঁথে নেয়ার ফল।

এতসব কিছুর ফলাফল হলো আমরা আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ হারিয়েছি ও আমাদের নৈতিক অবক্ষয় হয়েছে যার জন্য পারিবারিক বন্ধন কমে গিয়ে অহরহ ডিভোর্স হচ্ছে আর বৃদ্ধ পিতা মাতা কে বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে এবং সন্তানরা বিপথে যাচ্ছে।

কিন্তু এতসব অপ্রাসঙ্গিক কাজ করে কি আদৌতে কোন লাভ আছে কি! অন্যের সংস্কৃতি অনুকরণ করে আমরা কখনোই স্মার্ট আর মডার্ণ হতে পারবো না। আমরা বিদেশী সংস্কৃতির কুফল নিয়ে অনেকদিন থেকেই প্রতিবাদ করে আসছি। অনুকরণ যদি করতেই হয় তাহলে আকাশ সংস্কৃতির খারাপ দিক গুলোই কেন অনুকরণ করছি? ভালো দিক গুলো কেন অনুকরণ করছি না? সবকিছুর যেমন ভালো মন্দ দিক আছে, সংস্কৃতির ও তেমনি ভালো-মন্দ দুটো দিকই আছে। অনুকরণ করতে চাইলে দুটো দিকই অনুকরণ করা উচিত।

হিন্দি সিরিয়ালের পোশাক, আচরণ, জীবন যাপনের ধারা অনুকরণ করা তে যদি আমরা এতটাই এগিয়ে থাকি, তাহলে হিন্দি সিরিয়ালের একটি অতি পরিচিত দৃশ্য হচ্ছে প্রতিদিন সকালে তারা পূজা পাঠ ও বিভিন্ন ধরণের দোয়া করে- আমরা এই দৃশ্য টা কি আমাদের জীবনে অনুসরণ করতে পারি না? আমরা দিনে কয় বেলা নামাজ আর দোয়া পড়ি?

বিদেশীদের জীবন যাপনের ধরণ আমাদের সংস্কৃতির সীমানার বহির্ভূত। বিদেশীরা তো শিক্ষার দিক দিয়ে অনেক এগিয়ে আছে। আমরা কি এই দিক টা অনুসরণ করে সুশিক্ষিত হওয়ায় তাগিদ নিতে পারি না? তাতে আমাদের দেশ ও জাতি উভয়েই উন্নত হবে।

হিন্দি সিরিয়ালের কুটনামি আর সংসারের অশান্তি দেখে আমাদের অনুকরণ করার ইচ্ছা কেন জাগে? আমরা এসব থেকে শিক্ষা কেন নেই না যে এসব আচরণ শুধু ক্ষতিই ডেকে আনে।অথবা আমরা শুধু নিছক বিনোদন এর মাধ্যম হিসেবে এগুলো দেখতে পারি।

ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জুকারবার্গ; ইউটিউব এর প্রতিষ্ঠাতাগণ হলেন জায়েদ করিম, চাদ হারলে এবং স্টিভ চেন আর টুইটার এর প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক ডরসে। এই অ্যাপস গুলো বিশ্ব স্বীকৃতি প্রাপ্ত এবং খুবই জনপ্রিয়। এখানে জায়েদ করিম ছাড়া সবাই বিদেশী। এই আবিষ্কার এর ধারা টা কি আমরা অনুসরণ করতে পারি না? আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এখন আগের চেয়ে উন্নত। নতুন নতুন আবিষ্কার করার মানসিকতা বাড়ানোর জন্য আমরা কেন মানসিকভাবে উদ্যোগ নিতে আগ্রহী হই না? তাতে যেমন ব্যক্তিগত উৎকর্ষ সাধন হবে তেমন দেশ সুনাম অর্জন করবে।

শিক্ষার একটি বেসিক প্রভাব হলো ভালো মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখা। তার মানে আমরা কোন কিছুর ভালো দিক গুলো গ্রহণ করব আর খারাপ দিক গুলো বর্জন করব। শিক্ষিত হয়েও যদি আমরা কোন ভিন দেশী জাতির খারাপ সংস্কৃতি গ্রহণ করি আর তার ফলাফল খারাপ হলে দোষ দেই সেই ভিন জাতি সংস্কৃতি কে। আসলে দোষটা তো আমাদেরই। আমাদেরই বোঝা উচিত যে খারাপ সংস্কৃতি গ্রহণ করলে তার ফলাফল তো খারাপ হবেই। আগে পিএইচডি করতে শিক্ষার্থীদের বিদেশ যেতে হতো। এখন দেশেই পিএইচডি করার সুযোগ আছে।

রোবট তৈরীতে আগে বিদেশী সংস্থার সাহায্য নিতে হতো। কিন্তু এখন দেশের তরুণ সমাজ রোবট তৈরিতে পারদর্শিতা দেখিয়েছে। এমন আরো অনেক উদাহরণ আছে যেখানে দেশের তরুণরা নতুন নতুন আবিষ্কার করে দেশকে উন্নতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

এসব উদাহরণ গুলো কি যথেষ্ট না জাতি কে শেখানোর জন্য যে আমরা অপ্রয়োজনীয় সংস্কৃতি শেখার কাজে কালক্ষেপন না করে ফলদায়ক কোন কাজে মনযোগী হই, যেগুলো ভবিষ্যত জীবনে ব্যক্তিগত ও জাতিগত পর্যায়ে উন্নতি এবং সুনাম আনবে।

আকাশ সংস্কৃতির অবাধে বিস্তারিত হওয়ার ফলে দেশী বিদেশী সকল ধরণের দর্শকদের সংস্কৃতি সম্পর্কে যথেষ্ট মানসম্মত ধারণা আছে। এক্ষেত্রে টিভি মিডিয়া মালিকদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে। কারণ দেশীয় মিডিয়ার অনুষ্ঠানের ধরন যদি মানসম্মত না হয় তাহলে দর্শকদের বিদেশী সংস্কৃতির প্রতি ঝুঁকে যাবার প্রবণতা বেড়ে যাবে।

বিদেশী সংস্কৃতি মানেই যে খারাপ – এই কথাটি মোটেই ঠিক না। সব সংস্কৃতির মধ্যেই ভালো খারাপ আছে। নৈতিক গুনাবলী বজায় রাখতে হলে অবশ্যই খারাপ দিক গুলো বর্জন করতে হবে। আর যেসব সংস্কৃতি গ্রহণের ফলে শুধুই অপচয় এবং ক্ষতি হয় সেসব গ্রহণ করে বোকামী করার চেয়ে যেসব সংস্কৃতি গ্রহণের ফলে ভবিষ্যতে উন্নত হওয়ার উপাদান খুঁজে পাওয়া যায়, সেসব গ্রহণ করে আত্বস্থ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।